কয়লা খনির উন্নয়ন

বাংলাদেশে কয়লার মজুদ

ক্রঃ নং কয়লা ক্ষেত্রের নাম রিজার্ভ মিলিয়ন মেট্রিক টন
বড়পুকুরিয়া, দিনাজপুর ৩৯০
খালাসপীর, রংপুর ৬৮৫
জামালগঞ্জ, জয়পুরহাট ৫৪৫০
ফুলবাড়ি, দিনাজপুর ৫৭২
দিঘীপাড়া, দিনাজপুর ৮৬৫
মোট = ৭৯৬২ মিলিয়ন মেট্রিক টন

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উন্নয়ন

প্রকল্পকালীন সময়ের উন্নয়নঃ

 বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) ১৯৮৫ সালে দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলাধীন বড়পুকুরিয়া এলাকায় ৬.৬৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ১১৮-৫০৯ মিটার গভীরতায় উন্নতমানের বিটুমিনাস কয়লার সন্ধান লাভের পর ওডিএ-এর আর্থিক সহায়তায় যুক্তরাজ্য ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মেসার্স ওয়ার্ডেল আর্মস্ট্রং উক্ত কয়লা মজুদের উপর একটি আর্থ-কারিগরী সমীক্ষা পরিচালনা করে। সমীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে বছরে ১ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন একটি ভূ-গর্ভস্থ খনি উন্নয়নের লক্ষ্যে পেট্রোবাংলা এবং চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইম্পোর্ট এন্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএমসি)-এর মধ্যে একটি নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। খনি নির্মাণ কাজ শেষে নির্মাণ ঠিকাদারের নিকট থেকে সেপ্টেম্বর ২০০৫ মাসে খনিটি বুঝে নেওয়া হয়।

চুক্তি ও কার্যক্রমঃ

প্রথম এমএন্ডপি চুক্তি-২০০৫ ও এর কার্যক্রমঃ

 বডপুকুরিয়া কয়লা খনি হতে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন ও উন্নয়ন কার্যক্রম নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে চীনা প্রতিষ্ঠান সিএমসি-এক্সএমসি কনসোর্টিয়াম-এর সঙ্গে ৮২.৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যমানের একটি ম্যানেজমেন্ট এন্ড প্রোডাকশন (এমএন্ডপি) চুক্তি ৪ জুন ২০০৫ তারিখে স্বাক্ষরিত হয় । চুক্তি অনুযায়ী এমএন্ডপি ঠিকাদার ১০ সেপ্টেম্বর ২০০৫ তারিখ হতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কয়লা উৎপাদন শুরু করে এবং চুক্তির মেয়াদ ১০ আগস্ট ২০১১ তারিখে উত্তীর্ণ হওয়ার পর সফলভাবে চুক্তি সমাপ্তিকরণের কাজ শেষ করে। এ চুক্তির আলোকে ৪৭.৫০ লক্ষ মেট্রিক টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৩৬.৫০ লক্ষ মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদিত হয়।

দ্বিতীয় এমপিএমএন্ডপি-২০১১ চুক্তি ও এর কার্যক্রমঃ

 কয়লা উৎপাদন অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবানের মাধ্যমে চীনা ঠিকাদার এক্সএসমি-সিএমসি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে  “ম্যানেজমেন্ট, প্রোডাকশন, মেইনটেন্যান্স এন্ড প্রভিসনিং সার্ভিসেস (এমপিএমএন্ডপি)” চুক্তি গত ১০ ডিসেম্বর ২০১১ তারিখে স্বাক্ষরিত হয়, যা ১১ আগস্ট ২০১১ তারিখ থেকে কার্যকর হয়ে ১০ আগস্ট ২০১৭ তারিখে শেষ হয়। ৭২ মাস মেয়াদি এ  চুক্তির অধীনে ৫৫ লক্ষ মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৫৫.০৪ লক্ষ মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদিত হয়।

কয়লা উৎপাদন ছাড়াও উল্লেখযোগ্য অন্যান্য কাজের মধ্যে ঠিকাদার এক সেট এলটিসিসি যন্ত্রপাতি সরবরাহ, উৎপাদন সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় মালামাল ও খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের লক্ষ্যে ৫টি হাইড্রোজিওলোজিক্যাল বোরহোল খনন, ৩.৫০ ও ৩.৩৮ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন দু’টি জেনারেটর সরবরাহ ও স্থাপন, ভূ-গর্ভে ৩টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প স্থাপন, কুলিং ওয়াটারের চাহিদা বৃদ্ধির জন্য সারফেসে একটি ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন ইত্যাদি কাজ করেছে।

তৃতীয় এমপিএমএন্ডপি-২০১৭ চুক্তি ও এর কার্যক্রমঃ

নিরবচ্ছিন্নভাবে কয়লা উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে চীনা ঠিকাদার এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়াম-এর সঙ্গে নতুন এমপিএমএন্ডপি-২০১৭ চুক্তি গত ৮ জুলাই ২০১৭ তারিখে স্বাক্ষরিত হয়। ১১ আগস্ট ২০১৭ তারিখ থেকে কার্যকর করে পরবর্তী ৪৮ মাসের জন্য এ চুক্তি বলবৎ থাকবে। এ সময়ের মধ্যে ঠিকাদার ৩.২০৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদন ছাড়াও এক সেট এলটিসিসি ইকুইপমেন্ট সরবরাহ, উৎপাদন সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় মালামাল ও খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ, পর্যায়ক্রমে ৩টি ৩.৩৮ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন জেনারেটর স্থাপন, ভূ-গভের্র -৪৩০ মিটার ও -৫০০ মিটার লেভেলে ওয়াটার সাম্পসহ নতুন দু’টি পাম্প হাউস ও পাইপ শ্যাফট স্থাপন, খনির সেন্ট্রাল পার্টের তৃতীয় স্লাইস হতে কয়লা উত্তোলনের লক্ষ্যে ৬টি হাইড্রোজিওলোজিক্যাল বোর হোল খনন, ভূ-গর্ভের এনভায়রনমেন্টাল কন্ডিশনসহ সার্বিক তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কুলিং সিস্টেম ও অপ্রত্যাশিত গ্যাস নির্গমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন প্লান্ট স্থাপনের কাজ সম্পন্নের জন্য ঠিকাদারের দায়বদ্ধতা চুক্তিতে অন্তর্ভূক্ত আছে।

ঠিকাদার চুক্তি অনুযায়ী  নির্দিষ্ট সময়ে তাদের কাজ শুরু করেছে। প্রথম চুক্তি বছরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ০.৮১৯ মিলিয়ন মেট্রিক টনের বিপরীতে মার্চ ২০১৮ পর্যন্ত তারা ০.৬৪৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদন করেছে; যা লক্ষ্যমাত্রার ৭৯ শতাংশ। খনির শুরু থেকে মার্চ ২০১৮ পর্যন্ত মোট ১০.০২ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদিত হয়েছে। অপর দিকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ০.৮২ মিলিয়ন মেট্রিক টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মার্চ ২০১৮ পর্যন্ত ০.৭৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদিত হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উৎপাদন লক্ষমাত্রা অর্জিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এছাড়া ২,৫০০ মিটার রোডওয়ের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মার্চ ২০১৮ পর্যন্ত ২,৮৮৮.২০ মিটার উন্নয়ন কাজ শেষ হয়েছে; যা লক্ষ্যমাত্রা অপেক্ষা ১৫.৫ ভাগ বেশি।

কনসোর্টিয়াম তাদের চুক্তির আলোকে ভূ-গর্ভে ওয়াটার সাম্প, ও পাম্প হাউস নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। ৬টি হাইড্রোজিওলোজিক্যাল বোর হোল খনন কাজের জন্য ইতোমধ্যে ১টি বোরহোলে যাওয়ার জন্য রাস্তা ও পেভমেন্ট তৈরি সম্পন্ন হয়েছে, খুব শীঘ্রই বোরহোল খনন কাজ শুরু হবে। চুক্তির অন্যান্য কাজগুলি সিডিউল মোতাবেক শুরু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

বর্তমানে ১২১০ডি ফেইস থেকে কয়লা উৎপাদিত হচ্ছে। এ ফেইস থেকে ৪.৩০ লক্ষ মেট্রিক টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৪.৭০ লক্ষ মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদিত হয়েছে। ১৫ মে ২০১৮ তারিখের মধ্যে এ ফেইস থেকে কয়লা উৎপাদন শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তৃতীয় স্লাইসের প্রথম ফেইস হিসেবে ১৩১৪ ফেইসের উন্নয়ন কাজ চলছে। জুলাই ২০১৮ মাস থেকে এ ফেইস থেকে কয়লা উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

স্লাইস এবংকয়লা উৎপাদন পদ্ধতি

প্রথম ও দ্বিতীয় স্লাইস হতে কয়লা উৎপাদনঃ

বড়পুকুরিয়ায় আবিষ্কৃত কোল বেসিনে ৬টি কোল সীম নিরূপিত হয়। ৬ষ্ঠ সীমের গড় পুরুত্ব ৩৬ মিটার। সেন্ট্রাল পার্টের প্রথম স্লাইস হতে ১০ সেপ্টেম্বর ২০০৫ তারিখ থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কয়লা উৎপাদন শুরু হয়, যা ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে সাফলভাবে শেষ হয়। এ সময়ের মধ্যে ১১টি লংওয়াল ফেইস থেকে সম্পূর্ণরূপে এবং ১টি লংওয়াল ফেইস (১১১০ লংওয়াল ফেইস) হতে আংশিকভাবে কয়লা উৎপাদিত হয়েছে। খনির প্রথম স্লাইস হতে সর্বমোট ৪১.৬৭ লক্ষ মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলিত হয়েছে।

প্রথম স্লাইস হতে কয়লা উৎপাদন শেষে দ্বিতীয় স্লাইস হতে ১৫ মার্চ ২০১২ তারিখ থেকে কয়লা উৎপাদন শুরু হয়। দ্বিতীয় স্লাইস-এর ১০টি ফেইস হতে মার্চ ২০১৮ পর্যন্ত মোট ৫৮.৬০ লক্ষ মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলিত হয়েছে। বর্তমানে ১২১০ডি ফেইস থেকে কয়লা উৎপাদিত হচ্ছে। ১৫ মে ২০১৮ তারিখের মধ্যে এ ফেইস থেকে কয়লা উৎপাদন শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তৃতীয় স্লাইসের প্রথম ফেইস হিসেবে ১৩১৪ ফেইসের উন্নয়ন কাজ চলছে। জুলাই ২০১৮ মাস থেকে এ ফেইস থেকে কয়লা উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

LTCC পদ্ধতিতে কয়লা উৎপাদনঃ

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি হতে কয়লা উত্তোলন কার্যক্রম লংওয়াল মাইনিং পদ্ধতি হতে উন্নীত করে গত ০৮ মে ২০১৩ তারিখ থেকে Longwall Top Coal Caving (LTCC)পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। এই পদ্ধতি প্রবর্তনের ফলে খনির কয়লা উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে ১২১০ ফেইসে প্রথম LTCC পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এ পদ্ধতিতে ৩ মিটার Cutting height কয়লা Front AFC এবং ২ মিটার Caving height -এর কয়লা Rear AFC-এর মাধ্যমে সংগ্রহ করায় অধিক হারে কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে। LTCC পদ্ধতি ব্যবহার করে ৬ টি ফেইস হতে সম্পূর্ণরূপে এবং ২টি ফেইস হতে আংশিকভাবে কয়লা উৎপাদন করা হয়েছে। বর্তমানে এ পদ্ধতিতে ১২১০ডি ফেইস হতে কয়লা উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। LTCC পদ্ধতি গ্রহণের ফলে বর্তমানে দৈনিক গড়ে প্রায় ৪,৫০০ মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলিত হচ্ছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ:

এমপিএমএন্ডপি চুক্তির কাজ তদারকি করার জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডিএমটি কনসাল্টিং লিমিটেড-কে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হতে একজন পরামর্শক সার্বক্ষণিক এমপিএমএন্ডপি ঠিকাদারের কাজ দেখাশুনা করেন এবং প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের অপরাপর অভিজ্ঞ পরামর্শকের মধ্যমে বিভিন্ন প্রতিবেদন রিভিউকরণ ও মতামত গ্রহণ করা হয়ে থাকে।

জামালগঞ্জ, ফুলবাড়ী, খালাসপীর কয়লাক্ষেত্র উন্নয়ন সংক্রান্ত

জামালগঞ্জ, ফুলবাড়ী ও খালাসপীর কয়লাক্ষেত্রসমূহে লাইসেন্স/দায়িত্বভার বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানী লিমিটেড (বিসিএমসিএল)-এর অনুকূলে প্রদানের জন্য ইতোঃপূর্বে পেট্রোবাংলার পত্র সূত্র নং-২৮.০২.০০০০.০৩৯.০৫.০০২.০৯/ ৪২৭, তারিখ: ৩০-১০-২০১৪ এর মাধ্যমে জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ বিভাগে অনুরোধ জানানো হয়েছে। বর্ণিত কয়লাক্ষেত্র তিনটির মধ্যে জামালগঞ্জ কয়লা ক্ষেত্রের কোন ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পাদন হয়নি। ফুলবাড়ী এবং খালাসপীর কয়লা ক্ষেত্রের ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন করা হলেও ফুলবাড়ী কয়লা ক্ষেত্র উন্নয়নের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারী কোন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। খালাসপীর কয়লা ক্ষেত্রের ফিজিবিলিটি স্টাডি বিএমডি’র নিকট সংরক্ষিত থাকায় কয়লা ক্ষেত্রটি উন্নয়নের লক্ষ্যে উক্ত প্রতিবেদন বিসিএমসিএল-এর হস্তগত প্রয়োজন বিধায় প্রতিবেদনসমূহ বিসিএমসিএল-কে প্রদানের নির্দেশনার জন্য পেট্রোবাংলা’র মাধ্যমে জ্বালানী ও খনিজ বিভাগে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে।